অন্য খবর

রেড মিট খাওয়া কি পুরোপুরি বন্ধ করতে হবে? যা জানা জরুরি

খাদ্যতালিকায় নিয়মিত গরু, খাসি বা অন্যান্য লাল মাংস এবং সসেজের মতো প্রক্রিয়াজাত মাংস থাকলে দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যের ওপর এর প্রভাব পড়তে পারে। গবেষণায় বেশি পরিমাণে লাল মাংস, বিশেষ করে প্রক্রিয়াজাত মাংস খাওয়ার সঙ্গে কোলোরেক্টাল ক্যানসারের ঝুঁকি বৃদ্ধির সম্পর্ক পাওয়া গেছে। এই ক্যানসার বৃহদান্ত্রের শেষাংশ, অর্থাৎ কোলন ও মলদ্বারকে আক্রান্ত করে।

তবে এর অর্থ এই নয় যে মাঝেমধ্যে মাংস খেলেই ক্যানসার হবে। উদ্বেগের মূল বিষয় হলো দীর্ঘদিন ধরে নিয়মিত এবং বেশি পরিমাণে মাংস খাওয়া, বিশেষ করে প্রক্রিয়াজাত মাংস। মাংসের ধরন, পরিমাণ ও রান্নার পদ্ধতির পাশাপাশি সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাসও স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

রেড মিট ও প্রক্রিয়াজাত মাংসের মধ্যে পার্থক্য কী?

রেড মিট বা লাল মাংস: গরু, মহিষ, ভেড়া ও ছাগলের মতো স্তন্যপায়ী প্রাণীর মাংসকে লাল মাংস বলা হয়। এটি তাজা, কিমা করা কিংবা হিমায়িত অবস্থায় থাকতে পারে। তবে শুধু কিমা করা বা হিমায়িত করলেই মাংস প্রক্রিয়াজাত মাংসে পরিণত হয় না।

প্রক্রিয়াজাত মাংস: স্বাদ বাড়ানো বা দীর্ঘদিন সংরক্ষণের জন্য লবণ দেওয়া, বিশেষ প্রক্রিয়ায় সংরক্ষণ, গাঁজন কিংবা ধোঁয়ায় শুকানোর মতো পদ্ধতিতে মাংসের যে পরিবর্তন করা হয়, তাকে প্রক্রিয়াজাতকরণ বলা হয়। সসেজ, কর্নড বিফ এবং এভাবে তৈরি কিছু টিনজাত মাংস এর উদাহরণ।

প্রক্রিয়াজাত মাংস শুধু গরু বা খাসির মাংস থেকেই তৈরি হয় না। মুরগি বা অন্যান্য পোলট্রির মাংস দিয়েও এ ধরনের পণ্য তৈরি হতে পারে। মাংসের উৎসের পাশাপাশি সেটি কীভাবে প্রক্রিয়াজাত করা হয়েছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

মাংস খাওয়ার সঙ্গে কোলোরেক্টাল ক্যানসারের সম্পর্ক কী?

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) অধীন আন্তর্জাতিক ক্যানসার গবেষণা সংস্থা (আইএআরসি) লাল ও প্রক্রিয়াজাত মাংস নিয়ে বৈজ্ঞানিক প্রমাণ পর্যালোচনা করেছে। সংস্থাটি প্রক্রিয়াজাত মাংসকে মানুষের জন্য ক্যানসার সৃষ্টিকারী হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করেছে। কারণ, প্রক্রিয়াজাত মাংস খাওয়ার সঙ্গে কোলোরেক্টাল ক্যানসারের সম্পর্কের পক্ষে পর্যাপ্ত প্রমাণ রয়েছে।

অন্যদিকে, লাল মাংসকে মানুষের জন্য সম্ভবত ক্যানসার সৃষ্টিকারী হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে কোলোরেক্টাল ক্যানসারের সঙ্গে সম্পর্কের প্রমাণ প্রক্রিয়াজাত মাংসের তুলনায় সীমিত। এই শ্রেণিবিন্যাসের অর্থ এই নয় যে লাল মাংস খেলে নিশ্চিতভাবে ক্যানসার হবে। বরং প্রাপ্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণের শক্তি ও সীমাবদ্ধতা বিবেচনায় নিয়ে এই শ্রেণিবিন্যাস করা হয়েছে।

আইএআরসির পর্যালোচনায় দেখা গেছে, প্রক্রিয়াজাত মাংস খাওয়ার পরিমাণ বাড়ার সঙ্গে কোলোরেক্টাল ক্যানসারের ঝুঁকিও বাড়তে পারে। ১০টি গবেষণার তথ্য বিশ্লেষণ করে অনুমান করা হয়েছে, প্রতিদিন ৫০ গ্রাম প্রক্রিয়াজাত মাংস খাওয়ার সঙ্গে এই ক্যানসারের আপেক্ষিক ঝুঁকি প্রায় ১৮ শতাংশ বৃদ্ধির সম্পর্ক রয়েছে।

লাল মাংসের ক্ষেত্রে প্রমাণ তুলনামূলকভাবে কম নিশ্চিত। আইএআরসির মূল্যায়ন অনুযায়ী, লাল মাংস খাওয়ার সঙ্গে ক্যানসারের সম্পর্কটি যদি কার্যকারণমূলক হয়, তাহলে প্রতিদিন ১০০ গ্রাম লাল মাংস খাওয়ার সঙ্গে কোলোরেক্টাল ক্যানসারের ঝুঁকি প্রায় ১৭ শতাংশ বৃদ্ধির সম্পর্ক থাকতে পারে।

তবে এই পরিসংখ্যানের অর্থ বুঝতে হবে সতর্কভাবে। এখানে ঝুঁকির আপেক্ষিক পরিবর্তনের কথা বলা হয়েছে। প্রতিদিন নির্দিষ্ট পরিমাণ মাংস খেলেই কারও ক্যানসার হওয়ার সম্ভাবনা ১৭ বা ১৮ শতাংশ হবে, এমন নয়। ব্যক্তির বয়স, জীবনযাপন, পারিবারিক ইতিহাস এবং অন্যান্য ঝুঁকির ওপরও ক্যানসার হওয়ার সম্ভাবনা নির্ভর করে।

প্রক্রিয়াজাতকরণ ও রান্নার সময় কী ঘটে?

মাংস খাওয়ার সঙ্গে ক্যানসারের ঝুঁকির সম্পর্ক ব্যাখ্যা করতে গবেষকেরা কয়েকটি সম্ভাব্য প্রক্রিয়ার কথা বলেছেন। মাংস সংরক্ষণের জন্য ব্যবহৃত কিছু প্রক্রিয়ায় এন-নাইট্রোসো যৌগের মতো সম্ভাব্য ক্যানসার সৃষ্টিকারী পদার্থ তৈরি হতে পারে।

এ ছাড়া খুব বেশি তাপমাত্রায় মাংস রান্না করলে কিছু রাসায়নিক যৌগ তৈরি হয়। বিশেষ করে গ্রিল, বারবিকিউ বা প্যানে বেশি তাপে মাংস ভাজার সময় হেটেরোসাইক্লিক অ্যারোমেটিক অ্যামাইন এবং পলিসাইক্লিক অ্যারোমেটিক হাইড্রোকার্বনের মতো যৌগ তৈরি হতে পারে। এসব যৌগের কিছু ক্যানসারের ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত।

তবে মাংসের ধরন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, রান্নার তাপমাত্রা ও পদ্ধতি এবং ক্যানসারের ঝুঁকির মধ্যে সম্পর্ক জটিল। এই প্রক্রিয়াগুলোর সব দিক এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। তাই শুধু রান্নার পদ্ধতি পরিবর্তন করলেই প্রক্রিয়াজাত মাংস খাওয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত সব ঝুঁকি দূর হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।

মাংস খাওয়া কি পুরোপুরি বন্ধ করতে হবে?

সবার জন্য লাল মাংস পুরোপুরি বাদ দেওয়া জরুরি, এমন নয়। লাল মাংসে প্রোটিন, আয়রন, জিঙ্ক ও বি ভিটামিনের মতো প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান রয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও মাংসকে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের অংশ হিসেবে বিবেচনার সুযোগ রেখেছে। তবে কতটা মাংস খাওয়া হচ্ছে এবং খাদ্যতালিকায় অন্য কী কী খাবার রয়েছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

ঝুঁকি কমাতে প্রক্রিয়াজাত মাংসকে প্রতিদিনের খাবারের নিয়মিত অংশ না করাই ভালো। সসেজ, কর্নড বিফ ও এ ধরনের অন্যান্য পণ্য কম খাওয়া যেতে পারে। পাশাপাশি খাবারে শাকসবজি, ফল, ডাল, শিমজাতীয় খাবার ও পূর্ণশস্যের পরিমাণ বাড়ানো যেতে পারে।

লাল মাংস খাওয়ার ক্ষেত্রেও পরিমাণের দিকে নজর রাখা এবং বৈচিত্র্যপূর্ণ খাদ্যাভ্যাস বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ। স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের জন্য শুধু একটি খাবার বাদ দেওয়ার পরিবর্তে সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক সক্রিয়তা ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর অভ্যাসের দিকেও মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন।

সম্পর্কিত খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button